ইমাম আবু হানিফা রহ. কি সুন্নাহ বিরোধী আমল করতেন?

🕋 ইমাম আবু হানিফা রহ. কি সুন্নাহ বিরোধী আমল করতেন?
ইমাম আবু হানিফা রহ. একটানা ৪০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। যার ফলে অনেকেই বলছেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. সারারাত জাগ্রত থাকার দরুণ সুন্নাহ বিরোধী আমল করেছেন! কারণ প্রিয় নবীজি দঃ রাতের বেলায় ঘুমাতেন। 
👉তাদের জবাবে বলব, প্রিয় নবীজি (দঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম সারারাত জেগে এবাদত করেছেন মর্মেও একাধিক হাদিস বর্ণিত রয়েছে। অতএব, সারারাত জেগে ইবাদত করাকে সুন্নাহ বিরোধী বলার কোন সুযোগ রইল না। আর এই সুন্নাহ মোতাবেক পরবর্তীতে বহু সংখ্যক সালাফগণ আমল করেছেন। যাদের মধ্যে একদল সাহাবী ও তাবেঈ রয়েছে। নিচের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হলো। 
📖ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. একটানা ৪০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন মর্মে বর্ণনাটি খতীবে বাগদাদী রহ. সনদ সহকারে এভাবে বর্ণনা করেছেন-
أَخْبَرَنَا علي بن المحسن المعدل، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو بكر أَحْمَد بن مُحَمَّد بن يَعْقُوب الكاغدي، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو مُحَمَّد عبد الله بن مُحَمَّد بن يَعْقُوب بن الحارث الحارثي البخاري ببخارى، قَالَ: حَدَّثَنَا أَحْمَد بن الحسين البلخي، قَالَ: حَدَّثَنَا حماد بن قريش، قال: سمعت أسد بن عمرو، يقول: صلى أَبُو حنيفة فيما حفظ عليه صلاة الفجر بوضوء صلاة العشاء أربعين سنة، فكان عامة الليل يقرأ جميع القرآن في ركعة واحدة، وكان يسمع بكاؤه بالليل حتى يرحمه جيرانه، وحفظ عليه أنه ختم القرآن في الموضع الذي توفي فيه سبعة آلاف مرة»
অর্থাৎ, আসাদ বিন আমর রহ. বলেছেন,
“আবু হানিফা এর ব্যাপারে যতটুকু সংরক্ষিত হয়েছে তাতে তিনি চল্লিশ বছর যাবত ইশার সালাতের অজু দ্বারা ফজরের সালাত আদায় করেছেন। তিনি অধিকাংশ রাতে এক রাকআত সালাতে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করতেন! রাতে তার কান্নার আওয়াজ শোনা যেত। ফলে তার প্রতিবেশীরা তার উপর দয়া করতেন। আরও সংরক্ষিত হয়েছে যে, তিনি যে স্থানে মারা গেছেন সে স্থানে ৭,০০০ (সাত হাজার) বার কুরআন খতম করেছেন!” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৮৪; মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা পৃঃ ২৩)  

📖এ বর্ণনার সনদে عبد الله بن مُحَمَّد بن يَعْقُوب "আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন ইয়াকুব" নামে একজন রাবী আছে। যাকে ইমাম আবু যুরাআ রাজি ও ইমাম খালিলী রহ. ضعيف বলেছেন। খতিব বাগদাদী রহ. বলেছেন- لا يحتج به তার উপর নির্ভর করা যায়না। ইমাম হাকেম রহ. বলেছেন- صاحب عجائب وافراد عن الثقات -"সে বিশ্বস্ত রাবী থেকে আশ্চর্যজনক বর্ণনাকারী।" 
এছাড়া আবু সাঈদ রওয়াস নামক এক অখ্যাত ব্যক্তি তাকে হাদিস বানানোর অভিযোগ দিয়েছেন। (যাহাবি: মিযানুল ইতিদাল, রা/৪৫৭১)
অতএব, আসমাউর রিজাল ও উসুলে হাদীসের মানদন্ডে এই বর্ণনাকে জাল বা ভিত্তিহীন বলার কোন সুযোগ নেই। 
📖স্বয়ং ইমাম যাহাবী রহ. তদীয় কিতাবে এ বিষয়ে আরো দুইটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, 
وروي يحي الحماني عن ابيه أنه قال: صحبت أبا حنيفة ستة اشهر، فما رايته صلى الغداة الا بوضوء العشاء، وكان يختم القرآن كل ليلة عند السحر.
وروي حبان بن بشر عن حكام بن سلم عن ابي سفيان قال: كنا نختلف الي عمرو بن مرة، فكان ابو حنيفة صلي العشاء والفجر بطهور واحد.
অর্থাৎ, ইয়াহিয়া হাম্মানি তার পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সাথে ছয় মাস সোহবতে ছিলাম, তিনি এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করার আমল ব্যতীত একদিনও দেখিনি। 
হযরত আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা আমর বিন মুররা রহ. এর নিকট মতানৈক্যতার মধ্যে ছিলাম। হযরত আবু হানিফা রহ. ইশার নামাজ ও ফজর নামাজ এক অজু দিয়েই আদায় করতেন। (যাহাবী: মানাকিবু ইমাম আবি হানিফা, ২১ পৃ. তারিখু বাগদাদ, ১৩/৩৫৫)
এমনকি আহমদ ইবনে ইউনুস রহ. ভিন্ন আরেকটি সূত্রে বলেন যে, হযরত আবু হানিফা রহ. এশার সালাতের অজু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেছেন। (তারিখু বাগদাদ, ১৩/৩৫৫)


📖ইমাম নববী রহ. তার 'তাহজিবুল আসমাই ওয়াল লুগাত' এর ২য় খন্ড ২২০ পৃষ্ঠা, 
ইমাম ইউসুফ মিযযী রহ. 'তাহযিবুল কামাল' গ্রন্থের ২৯তম খন্ডের ৪৩৪ পৃষ্ঠায়,
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রহ. তদীয় 'মাগানিল আখইয়ার' গ্রন্থের ৩য় খন্ড ১৩৮ পৃষ্ঠায়,
ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী রহ. তদীয় 'মেরকাত শরহে মেসকাত' এর ১ম খন্ড ৩০ পৃষ্ঠায়,
ইমাম ইবনু কাসির রহ. তদীয় 'আত-তাকমীল ফি জারহি ওয়া তাদিল' কিতাবের ১ম খন্ড ৩৭৭ পৃষ্ঠায় উক্ত বর্ণনার কোন প্রকার সমালোচনা ব্যতীত উল্লেখ করেছেন।  
এমনকি تاريخ المنتحالي এর সূত্রে উল্লেখ রয়েছে- ইমাম মালেক রহ. ما يصلي الصبح الا بوضوء العشاء অর্থাৎ তিনি এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। সেখানেও وأربعين سنة চল্লিশ বছরের কথা উল্লেখ আছে। (মুগলতাঈ: ইকমালু তাহযিবিল কামাল, ১১/৩০)
হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইব রহ. ৫০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজর নামাজ আদায় করতেন। হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বাহ রহ. ৪০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজর নামাজ আদায় করতেন। এরূপ বহুসংখ্যক সালাফগণ আমল করেছেন।
📖ইমাম জয়নুদ্দিন ইবনু আব্দিল আযিয আল-হিন্দী রহ. (ওফাত ৯৮৭ হি.) তদীয় কিতাবে বলেন-
وصلي عبد القادر الجيلاني رحمة الله عليه الصبح بوضوء العشاء اربعين سنة. 
অর্থাৎ হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ. ৪০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। (আল ইস্তেদাত লিল মাউত, ১৯ পৃ.)
🕋এমনকি সাহাবায়ে কেরাম অনুরূপ রাত জেগে এবাদত করতেন। যেমন হাফেজ ইবনে তাইমিয়া সাহাবীদের আমল সম্পর্কে তদীয় 'আল-ফাতাওয়াল কুবরা' গ্রন্থের ২য় খন্ডের ১৪০ পৃষ্ঠায় বলেছেন-
أنه كان يقوم جميع الليل دائما، او أنه يصلي الصبح بوضوء العشاء الآخرة، كذا كذا سنة مع ان كثيرا من المنقول من ذلك ضعيف. 
অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি (সাহাবী ইবনে উমর রাঃ) প্রত্যেক রাত্রে নিয়মিত নফল নামাজ আদায় করতেন, অর্থাৎ তিনি এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন, অনুরূপ করা সুন্নাহ। কেননা এ বিষয়ে প্রচুর পরিমাণে দুর্বল সনদের মানকুল বা বর্ণনা রয়েছে। তিনি রাসূলে আকরাম দঃ এঁর রাতের নফল নামাজ সম্পর্কে আরো বলেন-
وكذلك قيام بعض الليالي جميعها كالعشر الاخير من رمضان، او قيام غيره احيانا، فهذا مما جاءت به السنن، وقد كان الصحابه يفعلونه،
অর্থাৎ, অনুরূপভাবে রাসুলে পাক দঃ কোন কোন রাতে রমজান মাসে শেষ ১০ দিন ও অন্যান্য রাতে জাগ্রত থাকার ন্যায় সারারাত্র ব্যাপী নফল নামাজ আদায় করতেন। ইহার দ্বারা এই সুন্নাহ বা রীতি প্রচলিত হয়ে এসেছে। আর অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম অনুরূপ আমল করেছেন।" তিনি আরো উল্লেখ করেছেন-
وفي السنن انه قام بآية ليلة حتى اصبح: ان تعذبهم فانهم عبادك... ولكن غالب قيامه كان جوف الليل وكان يصلي بمن حضر عنده كما صلى ليلة بابن عباس وليلة بابن مسعود وليلة حذيفة بن اليمان، وقد كان أحيانا يقرأ في الركعة بالبقرة والنساء وآل عمران...
অর্থাৎ সুন্নাহ এর মধ্যে রয়েছে, তিঁনি (প্রিয় নবীজি) রাতের নামাজে আয়াত দ্বারা এমনভাবে কিয়াম করতেন ফলে ভোর হয়ে যেত।... তিঁনি রাতের নামাজে এমনভাবে গালেব হতেন যে শেষরাত্র হয়ে যেত। তিনি যখন নামাজ আদায় করতেন তখন তিঁনার নিকট হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ উপস্থিত থাকতো, কোন রাত্রে ইবনে মাসুদ রাঃ অথবা কোন রাত্রে হুজাইফা ইবনে ইয়ামান রাঃ উপস্থিত থাকতো। আর তিঁনি এমনভাবে (নামাজের দ্বারা) জাগ্রত থাকতেন যে, এক রাকাতে সূরা বাকারা সূরা নিসা ও সূরা আলে ইমরান পাঠ করতেন। (ইবনে তাইমিয়া: মাজমুউল ফাতওয়া, ২২/৩০৪)  
📖হাফিজুল হাদিস ইমাম ইবনু জাওযী রহ. সালাফদের রাতের নামাজ কেন্দ্র করে ৭ভাগে ভাগ করেছেন। এরমধ্যে প্রথমটি লক্ষ্য করুন-
الطبقة الاولى: كانوا يحيون كل ليلة، وفيهم من كان صلي الصبح بوضوء العشاء. وكان ابن عمر يحيي اليل، ومن القوم سعيد بن المسيب وصفوان بن سليم المدنيان وفضيل بن عياض....
প্রথম স্তর: তাঁরা (সাহাবাগণ) সমগ্র রাত জাগ্রত থাকতেন, তাঁরা ইশার নামাজের অজু দিয়ে ফজর নামাজ আদায় করতেন। হযরত ইবনে উমর রাঃ সারা রাত্র জাগ্রত থাকতেন ও সাঈদ ইবনুল মুসাইব রাঃ এর গোত্র, সাফয়ান ইবনে সুলাইম মাদানি, ফুদ্বাইল ইবনে আয়াদ্ব, তাউস, ওহাব ইবনে মিনাব্বাহ রহ.সহ আরো অনেকে। (ইবনে জাওযী: আত-তাবসিরা, ২/২৯৬)
📖ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন-
صلي كثير من السلف صلاة الصبح بوضوء العشاء عشرين سنة ومنهم من صلي كذلك أربعين سنة...
অর্থাৎ, প্রচুর সংখ্যক সালাফগণ ২০ বছর এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এশার নামাজের অজু দিয়ে ৪০ বছর ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। (ইবনে রজব: লাতাইফুল মাআরিফ, ৪৩ পৃ.)
📖হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রহ. উল্লেখ করেন- 
وقد كان ذلك طريق جماعة من السلف كانوا يصلون الصبح بوضوء العشاء. حكى ابو طالب المكي ان ذلك حكى على سبيل التواتر والاشتهار عن أربعين من التابعين،
অর্থাৎ একদল সালাফদের থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত রয়েছে যে, তারা ইশার নামাজের ওযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। আবু তালেব মক্কী রহ. চল্লিশ জন তাবেঈ থেকে তাওয়াতুর পর্যায়ের সূত্রে প্রসিদ্ধভাবে এরূপ বর্ণনা করেছেন। (গাজ্জালী: এহইয়া উলুমুদ্দিন, ১/৩৫৯) 
এ বিষয়ে প্রচুর পরিমাণ রেওয়ায়েত ও দলিল আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। যা ব্যাপকতার কারণে বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করা সম্ভব না। 
❤️পূর্বসূরী আইম্মায়ে কেরাম ও আউলিয়া কেরাম সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখুন, তারা সুন্নাহ বিরোধী ছিলেন না বরং দুনিয়া বিমুখ ও আখেরাতমুখী ছিলেন। 

No comments

Powered by Blogger.