জুমআ মুবারক" বলে শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী

প্রশ্ন: সম্মানিত আলেমগণ নিম্নোক্ত বিষয়ে কী বলেন: মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, তারা একে অপরকে "জুমআ মুবারক" বলে শুভেচ্ছা জানায় বা মেসেজ পাঠায়। কিছু লোক এর সমালোচনা করে বলে যে, এটি সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত নয় বা এটি বিদআত, তাই এ থেকে বিরত থাকা উচিত। অন্যদেরকে "জুমআ মুবারক" বলে শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী? এটা কি জায়েয?

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اَلْجَوَابُ بِعَوْنِ الْمَلِکِ الْوَھَّابِ اَللّٰھُمَّ ھِدَایَۃَ الْحَقِّ وَالصَّوَابِ

উত্তর: অন্যদেরকে "জুমআ মুবারক" বলে শুভেচ্ছা জানানো শরীয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ জায়েয; বরং এটি একটি ভালো কাজ। এর কারণগুলো নিম্নরূপ:

১. জুমআর দিন অন্যান্য দিনের মতো নয়। এটি সপ্তাহের সমস্ত দিনের মধ্যে সবচেয়ে বিশেষ দিন। হাদীসসমূহে এই দিনকে মুসলমানদের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন ঈদের দিন খুশির দিন হওয়ার কারণে আমরা মানুষকে শুভেচ্ছা জানাই, তেমনি জুমআর দিন সকল মুসলমানের জন্য আনন্দের দিন হওয়ায় এ দিনেও শুভেচ্ছা জানাই। আনন্দ প্রকাশের নিয়তে জুমআর দিনের আগমনে মানুষকে শুভেচ্ছা জানাতে কোনো সমস্যা নেই।

২. "জুমআ মুবারক" বলা প্রকৃতপক্ষে অপর ব্যক্তির জন্য বরকতের দোয়া। আর দোয়া করার নির্দেশ পবিত্র কুরআনে রয়েছে। সুতরাং আমরা যেমন সাধারণ দিনগুলোতে অন্যের জন্য বরকত ইত্যাদির দোয়া করতে পারি, তেমনি জুমআর দিনেও তা করতে পারি।

৩. "জুমআ মুবারক" বলে শুভেচ্ছা জানানো মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি ও ছড়িয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যমও হতে পারে, যা শরীয়তের নির্দেশ এবং তাই একটি সম্মানজনক কাজ।

৪. বিপুল সংখ্যক মুসলমান একে অপরকে জুমআ মুবারক বলে এবং একে ভালো কাজ মনে করে। মুসলিম জনসাধারণের নিকট যা ভালো কাজ, আল্লাহর দরবারেও তা ভালো বলে গণ্য (যতক্ষণ তা শরীয়তের পরিপন্থী না হয়; আর জুমআর দিনে শুভেচ্ছা জানানো শরীয়তের পরিপন্থী নয়)।

সার্বিক বিবেচনায়, "জুমআ মুবারক" বলাকে নাজায়েয বলার পক্ষে কোনো শরয়ী প্রমাণ নেই। শরীয়তের সাধারণ মূলনীতি থেকে স্পষ্ট যে, এটি জায়েয, এমনকি প্রশংসনীয় কাজ। এ কারণেই "জুমআ মুবারক" বলা শরীয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ ও পছন্দনীয়।

দোয়া করা সাধারণভাবে শরীয়তের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

﴿اُجِیۡبُ دَعْوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ﴾
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: আমি দোয়াকারীর দোয়া কবুল করি, যখন সে আমাকে ডাকে। (পারা ২, সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:

﴿اُدْعُوۡنِیۡۤ اَسْتَجِبْ لَکُمْ﴾
অনুবাদ (কানযুল ঈমান): "আমাকে ডাকো, আমি কবুল করব।" (পারা ২৪, সূরা মু'মিন, আয়াত ৬০)

জুমআর দিন সমস্ত দিনের সেরা এবং আনন্দের দিন। প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেছেন:

"নিশ্চয়ই জুমআর দিন সমস্ত দিনের সরদার এবং আল্লাহর নিকট সেগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৯, হাদীস ১০৯৮, বৈরুত)

তিনি আরও ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই এটি ঈদের দিন, যা আল্লাহ মুসলমানদের জন্য বানিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৯, হাদীস ১০৯৮, বৈরুত)

মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া শরীয়তের নির্দেশ। নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন:

"তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না ঈমান আনো; আর তোমরা (পূর্ণ) মুমিন হবে না, যতক্ষণ না একে অপরকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? তোমাদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।" (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ. ৭৪, হাদীস ৫৪, বৈরুত)

যেকোনো আনন্দের উপলক্ষে অভিনন্দন জানানো বিভিন্ন দিক থেকে জায়েয; এমনকি এটি একটি ভালো কাজ হিসেবেও গণ্য।আল-মাওসূআ আল-ফিকহিয়্যা আল-কুওয়াইতিয়্যা-তে লেখা আছে:

অনুবাদ: অভিনন্দন জানানো সাধারণভাবে মুস্তাহাব, কেননা এটি এমন একটি কাজ যাতে একজন মুসলমান তার মুসলমান ভাইকে এমন বিষয়ে দোয়া ও বরকতে শামিল করে, যা তাকে খুশি ও সন্তুষ্ট করে; এবং কারণ এটি মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা, আত্মীয়তা ও সহানুভূতি ছড়ানোর মাধ্যম। মুমিনদের প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য অভিনন্দনের উল্লেখ পবিত্র কুরআনেও এসেছে: "তৃপ্তির সাথে খাও ও পান করো; তোমাদের নেক আমলের প্রতিদান।" (পারা ২৯, সূরা মুরসালাত, আয়াত ৪৩)। যা কিছু খুশি ও আনন্দ দেয় এবং আল্লাহ তাআলার শরীয়তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার জন্য অভিনন্দন জানানো বৈধ। (আল-মাওসূআ আল-ফিকহিয়্যা আল-কুওয়াইতিয়্যা, খণ্ড ১৪, পৃ. ৯৭, কুয়েত)

অধিকন্তু, অধিকাংশ মুসলমান যে কাজগুলোকে ভালো মনে করে, সেগুলো আল্লাহর দরবারেও প্রশংসনীয়। হাদীসে বর্ণিত আছে:

"মুসলমানরা যা ভালো মনে করে, তা আল্লাহর দরবারেও ভালো।" (আল-মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, খণ্ড ৩, পৃ. ৮৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত)

প্রশ্নে একটি আপত্তি রয়েছে যে, "জুমআ মুবারক" বলা এড়িয়ে চলা উচিত, কেননা কিছু লোক বলে এটি সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত নয় এবং বিদআত। এর সহজ উত্তর হলো — কোনো কিছু সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা নাজায়েয বা নিষিদ্ধ। এমন অনেক বিষয় আছে যা সুন্নাহতে পাওয়া যায় না, অথচ জায়েয, এমনকি পছন্দনীয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সাহাবী বা অন্য নেককার ব্যক্তির নামের পরে رضی اللہ عنہ বা رحمۃ اللہ علیہ বলা সুন্নাহ নয়, কিন্তু নাজায়েযও নয়; বরং আলেমগণ একে প্রশংসনীয় ঘোষণা করেছেন।

তানভীরুল আবসার-এ আছে:

অনুবাদ: সাহাবীদের জন্য رضی اللہ عنہ এবং তাবেঈন ও তাঁদের পরবর্তী আলেম ও নেককার ব্যক্তিদের জন্য رحمۃ اللہ علیہ ব্যবহার করা পছন্দনীয়। (তানভীরুল আবসার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫২০, পেশোয়ার)

মনে রাখবেন, কোনো কিছু বিদআত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা নাজায়েয। সেই বিদআতই নিষিদ্ধ, যা ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক অথবা কোনো সুন্নাতকে বিলুপ্ত করে। "জুমআ মুবারক" বলা এর কোনোটিই করে না। নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন:

"যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো রীতি চালু করে এবং তার পরে সে অনুযায়ী আমল করা হয়, তার জন্য সে অনুযায়ী আমলকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হবে, তাদের সওয়াবে কোনো কমতি ছাড়াই। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ রীতি চালু করে এবং তার পরে সে অনুযায়ী আমল করা হয়, তার জন্য সে অনুযায়ী আমলকারীদের সমপরিমাণ গুনাহ লেখা হবে, তাদের গুনাহে কোনো কমতি ছাড়াই।" (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪১, করাচী)

অন্য হাদীসে আছে:
"সবচেয়ে মন্দ বিষয় হলো নব-আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ, আর প্রতিটি বিদআত গোমরাহী।" (মিশকাতুল মাসাবীহ, খণ্ড ১, পৃ. ২৭, লাহোর)

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল-মিরকাত-এ লেখা আছে:
অনুবাদ: অর্থাৎ প্রতিটি মন্দ বিদআত গোমরাহী, কেননা নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন: "যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো রীতি চালু করে…(পূর্ণ হাদীস উপরে উল্লেখিত)।" (মিরকাতুল মাফাতীহ, খণ্ড ১, পৃ. ৩৩৭, কোয়েটা)

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী ইমাম শাফেঈ থেকে বর্ণনা করেছেন:

অনুবাদ: ইমাম শাফেঈ বলেছেন: "বিদআত দুই প্রকার: প্রশংসনীয় বিদআত ও নিন্দনীয় বিদআত। যা সুন্নাহর অনুকূল, তা প্রশংসনীয়; আর যা সুন্নাহর বিরোধী, তা নিন্দনীয়।"

অধিকন্তু, অনেক বিষয় বিদআত হওয়া সত্ত্বেও জায়েয, প্রশংসনীয়, এমনকি কখনো ওয়াজিবও। আল্লামা ইবনে হাজার হাইতামী বলেছেন:

অনুবাদ: বিদআত পাঁচ প্রকার: ওয়াজিব, মুস্তাহাব ইত্যাদি। এগুলো চেনার উপায় হলো— বিদআতটিকে শরীয়তের মূলনীতির আলোকে যাচাই করা হবে; যে হুকুমের অধীনে তা পড়ে, সে অনুযায়ীই তার বিধান হবে। ওয়াজিব বিদআতের উদাহরণ: নাহু শাস্ত্র (আরবী ব্যাকরণ) শিক্ষা দেওয়া, যার মাধ্যমে কুরআন ও হাদীস বোঝা যায়। হারাম বিদআত: কাদরিয়া সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকীদা। মুস্তাহাব বিদআত: মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং তারাবীহ নামাযের জন্য জামাতবদ্ধ হওয়া। মুবাহ (বৈধ) বিদআত: নামাযের পরে মুসাফাহা করা। (ফতোয়ায়ে হাদীসিয়্যা, পৃ. ১৫০, করাচী)

এই সমস্ত প্রমাণের পরেও যদি কেউ জোর দিয়ে বলে যে, "জুমআ মুবারক" বলা নাজায়েয এবং একে নিষিদ্ধ মনে করে, তাহলে তাকে অবশ্যই শরয়ী দলীলের স্পষ্ট উদ্ধৃতি পেশ করতে হবে। কেননা কোনো কিছুকে মাকরূহ, নাজায়েয বা হারাম বলার আগে প্রমাণ থাকা আবশ্যক।

আলেমগণ বলেছেন, কোনো কিছুকে মাকরূহ আখ্যা দেওয়ার আগে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা জরুরি। আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী বলেছেন:

অনুবাদ: কোনো কিছুকে মাকরূহ আখ্যা দিতে হলে এমন দলীল থাকতে হবে, যা নির্দিষ্টভাবে তা মাকরূহ প্রমাণ করে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৬৭, পেশোয়ার)

দ্রষ্টব্য: মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত অভিনন্দন-শুভেচ্ছা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীর وصول الامانی باصول التهانی গ্রন্থটি দেখুন।

وَاللہُ اَعْلَمُ عَزَّوَجَلَّ وَرَسُوْلُہ اَعْلَم صَلَّی اللّٰہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم
(আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত এবং তাঁর রাসূল ﷺ সর্বাধিক জ্ঞাত।)

উত্তর প্রদান করেছেন: মুফতী মুহাম্মাদ কাসিম আত্তারী
রেফারেন্স নং: PIN-7367
তারিখ: ৭ জুমাদাল উখরা ১৪৪৫ হিজরী / ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

No comments

Powered by Blogger.